Thursday, September 24, 2009

প্রাপ্যতা

এ শহরের বিলবোর্ডেরা অমর নয়,
অক্ষয় নয়,
এমনকি দীর্ঘায়ুও নয়।

নিতান্তই স্বল্পায়ু।

তাই বলে এইসব কিশোরীরাও নারী হবে,
নারীরাও প্রৌঢ়া হবে।
মৃতা হবে
দোমড়ানো মোচড়ানো নীল খামের মতোন।
মৃতা হবে।
তা ভুলেও ভাবিনি কখনো।

অচেনা,উষ্ণ জোয়ার তীব্র হয়,
আবাসিক ঘাটেরা হারায়,
হারায় শিউলী গন্ধ ভোর,
চোরাবালি সম্পর্কেরা থিতু হয়,
স্বপ্নালু বিল্পবীও বাঁধা পড়ে প্রাত্যহিকতায়।

নির্বাক,নির্লিপ্ত হয়ে ওঠে পরিচিত দরজারা,
ঘুণ ধরে আলাপের আড্ডায়,
সবকিছুই সংকুচিত হয়,
মেদহীন,ঈষৎ সংক্ষেপিত বার্তায়।

আমরাও আগের মতোন উতপ্ত নই,
প্রেমার্ত নই,কাব্যিক নই,
আমাদের বুকে শ্যামল প্রান্তর নেই,
রহস্য জোৎস্না নেই,
রূপালি বৃষ্টি নেই।

আমাদের কোন কিছুই নেই।
শুধু চলমান,বিজ্ঞাপিত-এই শোভাযাত্রা ছাড়া।

Saturday, September 19, 2009

কোন এক জলযানের প্রতি পংক্তিমালা

ফেব্রুয়ারির এক শীতল দিনে,
আমি বেড়িয়ে পড়েছিলাম
আমার অতীত,সম্পর্কহীন কৌম থেকে।

আমার গন্তব্য- সেই মহাজনপদ,
যার বাহন প্রাগৈতিহাসিক স্টিমার,
যা সহজেই আক্রান্ত করে
সাবেক,উপনিবেশিক নস্টালজিয়ায়।

রোদে-জলে পোড়া বর্ষিয়ান রেলিং,
বার্মিজ সেগুন ফাটলে,
রঙের পোঁচ পড়েনি বহুদিন,
সাদা,নিস্তব্ধ কেবিনেও আর
আসেনি কোন মধুচন্দ্রিমারত দম্পতি।
কেউ কি লক্ষ্য করেনি ?
কেউ কি দেখেনি চেয়ে ?
কেউ কি করেনি অনুকম্পা ?
এই সামান্য ভারবাহী নৌযানকে!

আমার ক্রমশ মনে হতে থাকে
আমিই এই স্টিমারের একনিষ্ঠ,
একান্ত,নিবিড় পাঠক।
আমিই টুকে নিচ্ছি সহস্র স্মৃতিকোষে
সময়ের পুঞ্জ পুঞ্জ অনুলিপি।

প্রশস্ত মোহনা থেকে উজানের পথে,
ম্লান থেকে ম্লানতর সবুজের দিকে
এইসব পথে ছুটে গেছে
বারবার,আবার,অনবরত
নির্ভুল কম্পাসের নির্দেশে।

এইসব জলজ পথ,যা ছুঁয়েছে
বিবর্ণ মরিচা-রঙা জেটি,
বিদায়প্রজ মানুষের ভীড়,
নাছোড়বান্দা শৈবালস্তুপ,
শীর্ণকায়া ধানসিঁড়ি,
আর ভাগ্যহত শুশুকের কংকাল।

কিন্তু তবুও রাত্রি নেমেছিল।
সেই শীতার্ত ভ্রমণে,
কালো হয়েছিল সবুজেরা,
অনুসরণপ্রিয় গাংচিলেরা হয়েছিল
নিরুদ্দেশ।
শুধু কালো নদীর বুকচেরা
ফেনারা আরো শাদা হয়ে উঠেছিল।

নিঃসঙ্গ শোঁ শোঁ ডেকের আহ্বানে,
আমি বসেছিলাম ব্যবহারজীর্ণ চেয়ারে।

ভুলেছিলাম পার্থিব সময়ের
টিক টিক,
শীতের তীক্ষ্ণ কটাক্ষ,
কিংবা আমার অরক্ষিত কেবিনকে।

হঠাৎই দেখা হয়েছিল,
সেইসব অপার্থিব নৌকাদের সাথে,
হলুদ শুধু হলুদ বাতির
(অন্য কোন রঙের নয়)।
ফুটন্ত খৈ এর মতোন,
অথবা কমলা বোঁটার
শিউলী ফুলের মতোন,
এখানে,ওখানে-
মেঘনার সমস্ত রূপালি,উদোম
নরোম বুক জুড়ে।

রাত কেটেছিল নিস্তরঙ্গ টেউয়ে,
ক্ষয়াটে হলুদ চাঁদ আর
বিরতিহীন ইঞ্জিনের
অপূর্ব,ক্লান্তিহীন প্রগলভতায়।

ভোরও এসেছিল তাঁর অনিবার্যতা নিয়ে।
কুয়াশা মোড়া বন্দরে,
আমার প্রথম পদার্পণেই
ফিরেয়েছিলাম আমার চোখ।

আমিও তাকিয়েছিলাম,
তবে ঠিক অন্যদের মতো নয়,
আরো অবনত দৃষ্টিতে,
আরো তীব্র প্রাবল্যে,
ভারী হয়ে আসা কোটরের
অভিকর্ষতায়।

আমার শীতার্ত,মলিন ঠোঁট
উন্মুক্ত হয়েছিল,
বের হয়েছিল বিবর্ণ,অস্ফুট স্বর।

ভেসে গিয়েছিলো
সেইসব অপরিণত পংক্তিমালা,
তীব্র শীতের মায়াহীন ঘূর্ণিতে।

Saturday, September 12, 2009

সমুদ্র নির্বাসন

এমনকি আমিও যেতে চাই তাহিতিতে
এইসব নিখুঁত,স্থবির দিন ফেলে,
আদিমতার শুদ্ধ সন্ধানে,অতর্কিতে,
যেখানে এখনো প্রাকৃত হৃদয়ের দেখা মেলে।

সমুদ্রের কুমারী গোপন ঘ্রাণ
শুষে নেবে আমার উতপ্ত নিঃশ্বাস।
মহুয়া তরুনীরা রাঙাবে চারপাশ,
যারা নয় একটুও ম্রিয়মান।

সেই সব আনত,উজ্জ্বল, রঙিন ক্যানভাসে
প্রগাঢ়,আদিম আর উদ্ধত জিজ্ঞাসারা
সওয়ার হবে বিবর্ণ,স্বপ্নিল,ডানাওয়ালা বাসে।

তাহিতির তীরে আমার কুঁড়েঘরে,গলিত অতীতেরা
প্রোথিত হবে। পুড়বে আমার প্রেমিকারা,
তাদের স্মৃতি,চুল,কপোল আর পরিপূর্ণ কষ্টেরা।

Monday, August 31, 2009

বিষাদের অভিজ্ঞান

বেদনাদের দ্বীপান্তর হচ্ছে।
ক্রমশ,ধীরে ধীরে,
এ নগর থেকে।

অগোত্রীয় কাঠের শ্যাওলা খোলে
অনাহূত আবর্জনা,
অপবিত্র পূঁজের মত
জমা হচ্ছে
নির্ভুল ঐকিক নিয়মে।

আনন্দ,আনন্দ
শুধু অশ্লীল আনন্দ।

আনন্দ,আনন্দ
বিজ্ঞাপন বণিতাদের মুখে,
সংবাদে,চায়ের আড্ডায়,
দাম্পত্যের বিছানায়,
এমনকি আমার একচ্ছত্র জানালায়;
এখন উঁকি দেয়
সাদা দাঁতের বিপ্লবী ক্যানভ্যাসার,
সর্বময় আনন্দের হাসিতে।

বেদনারা চলে যাচ্ছে,
চলে যাচ্ছে
অভিমানে,অবসাদে,
আলস্যের ঘুমের ঘোরে,
আনন্দের কর্কশ কশাঘাতে।

অভিজ্ঞান খুঁজে পেতে
আমি শত ক্রোশ নাগরিক
পদযাত্রায়;
এখনো পাইনি কোনো বেদনার
নিটোল নীল পদ্ম।

পাইনি কোন সুমেধাকে,
যে এসে দাঁড়িয়ে আছে
আটটি পদ্ম হাতে,জনাকীর্ণ নির্জনতায়,
আমারই অপেক্ষায়।

আমি শুধু বেদনাকে পেতে চেয়েছিলাম।

Saturday, August 1, 2009

কনস্ট্রাকশন

শুনে যাই, প্রতিদিনই শুনি;
কংক্রিটের অস্ফুট আস্ফালন,
অযুত নক্ষত্রের মতো গুনি
আমাদের পরিচিত - কনস্ট্রাকশন।

চেনা গলিপথ, সমুদ্র আকাশ
ঢাকে আলকাতরা রঙে;
গুঁড়ো গুঁড়ো পাথুরে নির্যাস,
প্রাগৈতিহাসিক গুহার ঢং-এ।


এখনো খসড়া লেখে গুলাগ দ্বীপেরা,
লেখে বিচ্ছিন্নতার আবাহণ,
(কিংবা প্রাত্যহিক ক্লিশে সোপ-অপেরা )
পটভূমিতে এই কনস্ট্রাকশন।

বুনো-আরণ্যক কৈশোরের স্মৃতিতে,
চড়ে বসে ধবল-ধূসর কাফন।
আর নিখুঁত বিনির্মাণ স্তুতিতে,
গড়ে ওঠে কর্কশ ইস্পাত বন।

আমাদের সলো কোরাস,প্রতি জনে জনে
বেরুতে চায়, হতে চায় মূর্তিমান অনশন,
ছিটকে যায়, ঠিকরে পড়ে, কোণে কোণে।
অটল, স্থির থাকে শুধু, আমাদের প্রিয় - কনস্ট্রাকশন।

Saturday, May 30, 2009

শহুরে শিশিরের পাশে

পৃথুলা,সাবেক
প্রেমিকার সাথে,
দেখা হবে লাভাময়তায়।

রাজপথে।

নিদাঘ সূর্যের তাপে,
গলে গলে পড়বে
সৌজন্যতা বোধ।

আপাত ভদ্রতায়,
শীতাতপ বিপণিতে,
রচিত হবে নিখুঁত
কথোপকথনের গোলটেবিল।

আমাদের পানীয়ের
প্রতিসরণ,
আমাদের উত্তল কাঁচ,
খুঁজবে খুব দ্রুততায়
ঈর্ষার বলিরেখা।

অতঃপর
ভগ্নদূতের মত,
ব্যর্থতা-গ্লানি-হতাশায়,
কাঁচদেয়ালের পাশে,
শহুরে শিশির জমেছে
যেখানে।

সেখানে,
ঠিক সেইখানে।

বসে থাকব
হাতে হাত রেখে।

নির্বাক আমরা।

Friday, May 29, 2009

বাস্তব মৃত্যুর পরে

বাস্তব মৃত্যুর পরে হয়ত
এমনই একটা দিন চাইব আমি।
পাটভাঙা শাড়ির মত
বৃষ্টির তীরে আহত বিকেল,
অথবা
চেরিফুলে আলুলায়িত বিকেল।

শবের মায়াগন্ধ মেখে,
চন্দন,ধূপ,কর্পূর ছুঁয়ে,
নীল,কালো,লাল,বেগুনী,
এমন রঙের চুম্বন পেয়ে,
ধীরে হয়ত আরো ধীরে ।

শেষযাত্রার উলম্ব আকাশ,
বধির বৃষ্টির বিনম্র ফোঁটা,
পথচারীর চকিত দৃষ্টি,
এসব কিছু এড়িয়ে
কাদা মাখা পদচিহ্ন
হয়ত ছড়িয়ে দেবে,
দীর্ঘশ্বাসের সংক্রামক বীজাণু ।

বাস্তব মৃত্যুর পরে হয়ত
এমনই দিন চাইব আমি ...